বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার শুধু সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করায় অর্থনীতির অন্য ভিত্তিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু। রাজধানীর পল্টনে গতকাল ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘কনভারসেশন উইথ ইআরএফ মেম্বারস’ অনুষ্ঠানে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় ইআরএফ সভাপতি রেফায়েত উল্লাহ মীরধা ও সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেমসহ সংগঠনের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়ে নিজের মতামত তুলে ধরে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘সুদহার বাড়িয়ে টাকার সরবরাহ কমালে ঋণপত্র খোলার পরিমাণ কমে যাবে। এতে পণ্যের সরবরাহ কমবে। অর্থাৎ মুদ্রার সরবরাহ কমাতে গিয়ে পণ্যের সরবরাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়া হবে। আর পণ্য সরবরাহের ঘাটতি থেকে তৈরি হয় দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি। সুতরাং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার পাশাপাশি দেশের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের দিকেও খেয়াল রাখতে হবে।’
তবে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আগের চেয়ে উন্নতি হচ্ছে বলে মনে করেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতির যে একদমই উন্নতি হচ্ছে না এমনটা নয়। তবে ব্যাংক খাতে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে তা একদিনে ঠিক হবে না। সরকার একদিকে খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, অন্যদিকে গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। ফলে যেসব ব্যাংককে দুর্বল বলা হয় তারা ক্রমেই ভালো করছে।’
অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পুরোপুরি উন্নতি করতে হলে গণতান্ত্রিক সরকার প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি বলেন, ‘একজন উপদেষ্টা বলেছেন যে তারা দায়িত্বে আছেন ক্ষমতায় নেই। এটা তো ভয়ংকর কথা। গণতান্ত্রিক সরকারের জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা থাকে। তাই দ্রুত নির্বাচন দেয়া, অন্তত নির্বাচন নিয়ে একটা রোডম্যাপ দেয়া অত্যন্ত জরুরি।’
সব ক্ষেত্রে সংস্কার দরকার নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘যেগুলো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সেগুলো তারা এখনই করতে পারে। তবে সাংবিধানিক সংস্কারগুলোর বিষয়ে সবার সঙ্গে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি প্রস্তাব তৈরি করে দিতে পারেন। তাতে ভবিষ্যতে যে-ই সরকারে আসুক তারা ওই সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করবে।’
আবদুল আউয়াল মিন্টু নতুন ‘দরবেশ’ হয়ে উঠবেন কিনা এমন প্রশ্ন করেন একজন সাংবাদিক। জবাবে এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘দরবেশ যদি হতেই চাইতাম আমার জীবনে এমন অনেক সুযোগ ছিল। দরবেশ সাহেবের চেয়েও অনেক ক্ষমতাবান ছিলাম একসময়। তখনই ক্ষমতার অপব্যবহার করে কিছু হইনি। সুতরাং ভবিষ্যতেও কিছু হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।’
ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য সম্পর্কে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বর্তমানে ভারতের সঙ্গে আমাদের একটা মনকষাকষি চলছে। এর কারণ, ভারত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক ভুলে গিয়ে শুধু একটি দলের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছে। এখন সেই সরকার আর ক্ষমতায় নেই, এটা ভারতের জন্য মেনে নেয়া কষ্টের। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের নীতি হচ্ছে, আগে আপনি (ভারত) ৫ আগস্টের নীতিগত স্বীকৃতি ঠিকমতো দিন; এরপর আমরা ভবিষ্যতের দিকে আগাই। আমিও মনে করি এটা যথাযথ চিন্তাধারা।’
ভারতকে বৃহৎ প্রতিবেশী উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের সম্পর্ক ভালো হওয়া উচিত। তবে একই সঙ্গে আত্মসম্মান যেন বজায় থাকে।’
গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক সরকারের মন্ত্রী, এমপিসহ অনেকের ব্যাংক হিসাব স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘অন্যায়ভাবে (ব্যাংক হিসাব) ফ্রিজ (স্থগিত) করাটা আমি নিজেও পছন্দ করি না। এখন যেটা ঘটছে, ইচ্ছা হলেই আরেকজনের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করে দেয়া হচ্ছে; এটা আইনসিদ্ধও নয়। বিষয়টি আদালতের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হওয়া উচিত। যদি উপযুক্ত প্রমাণ থাকে তাহলে অনুসন্ধান করে যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে ফ্রিজ করা যেতে পারে। আমার ব্যাংক হিসাবও ফ্রিজ করতে পারে, আপত্তি নেই; কিন্তু যাই করুক আইন অনুযায়ী করুক।’
সম্প্রতি বেক্সিমকো গ্রুপের পোশাক খাতের ১৬টি কোম্পানির মালিকানা বিক্রি করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘কারা বিক্রি করবে, কেন করবে? কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য বা প্রতিষ্ঠান নৈতিকও না, আবার অনৈতিকও না। এসব প্রতিষ্ঠান যারা চালায় তারা যদি অনৈতিক কিছু করে আইন মেনে তাদের বিচার হওয়া উচিত। এ নিয়ে আমি কিছু বলব না। মালিকদের শাস্তি হোক, কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান যেন বন্ধ না হয়। কোনো উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠান, যেখানে হাজার হাজার লোক কাজ করে, তা নিয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত অন্তর্বর্তী সরকার নেবে না সেটাই আশা করব।’